শালিক আমাদের দেশে অতি পরিচিত একটি পাখি। অনেকে শখ করে শালিক পাখি পুষে থাকেন। আবার অনেকের ইচ্ছা আছে পোষার। হয়তো একটা বাচ্চা পাখি ম্যানেজ করেছেন। কিন্তু জানেন না কীভাবে শালিক পাখি পালন করতে হয়। এদের খাবার কি, খাচার মাপ কি হবে ইত্যাদি।
আজ আমরা শালিক পাখি পালন পদ্ধতি সম্পর্কে জানবো।

শালিকের জাত
বাংলাদেশে কয়েক ধরনের শালিক পাওয়া যায়-
- গো শালিক: এদের গায়ের রঙ সাদা কালো। বিশেষ করে বুকের দিকে সাদা। চোখের চারদিকে লাল/কমলা। মাথা কালো রঙের। ডানার ফ্লাইয়িং ফেদার বা পালকে সাদা রঙ দেখা যায়। গাছের ডালে, বিদ্যুতের খুটিতে বাসা বানায়। গো শালিক খাচায় পোষা হয় না।
- ভাত শালিক: এদের গায়ের রঙ লালচে। চোখের চারদিকে হলুদ। মাথা কালো রঙের। ডানার ফ্লাইয়িং ফেদার বা পালকে সাদা রঙ দেখা যায়। গাছের কোটরে বা ইটের দেয়ালের গর্তে বাসা বানায়।
- ঝুটি শালিক: এদের গায়ের রঙ ছাই কালারের। চোখের চারদিকে হলুদ। ঠোঁটের উপরে, দুই চোখের মাঝে, নাকের ডগায় ছোট্ট একটি ঝুটি আছে। ডানার ফ্লাইয়িং ফেদার বা পালকে সাদা রঙ দেখা যায়। গাছের কোটরে বা ইটের দেয়ালের গর্তে বাসা বানায়।
- গাঙ শালিক: এদের গায়ের রঙ ছাই রংয়ের। চোখের চারদিকে লাল। পায়ের রঙ হলুদ। ডানার ফ্লাইয়িং ফেদার বা পালকে সাদা রঙ দেখা যায়। এরা নদীর তীরের মাটির দেয়ালে গর্ত করে বাসা বানায়। এজন্য এদের নাম গাঙ শালিক। এরা দলবদ্ধ হয়ে থাকে। এদের পোষ মানানো সব চেয়ে কঠিন। এরা দেখতে ঝুটি শালিকের মতই। প্রধান পার্থক্য চোখের চারদিকে লাল এবং কোন ঝুটি নেই।
এদের মধ্যে ঝুটি আর ভাত শালিক বেশি খাচায় পোষা হয়। গাঙ শালিক সহজে পাওয়া যায় না এবং পোষ মানানো কঠিন।
কোন জাতের শালিক কথা বলতে পারে
সব জাতের শালিকই কথা বলতে সক্ষম। তবে স্পষ্ট করে কথা বলে ঝুটি শালিক। এরা সহজেই কথা বলা শিখে যায়। ভাত শালিক একটু দেরিতে কথা বলা শুরু করে।
কথা বলা শেখানোর জন্য পাখির ছোট দুই অক্ষর দিয়ে নাম রাখবেন। যেমন, মিঠু, পিকু, টুকি ইত্যাদি। প্রতিদিন কিছুটা সময় ওর খাচার সামনে বসে আস্তে আস্তে ওর নাম ধরে ডাকবেন। দেখবেন এক মাসের মধ্যে শিখে যাবে। আপনি যদি কথা নাও শেখান তবুও এরা একটা দুইটা শব্দ এমনি এমনি শিখে যায়। আমার ঝুটি শালিক এমনি এমনিতেই ওর নাম শিখে গিয়েছিলো।
কোন সাইজের বাচ্চা শালিক পুষবেন
অনেকে একেবারে ছোট বাচ্চা নেন। একেবারে ছোট বাচ্চা বাচানোই কঠিন। মোটামুটি পাখা গজিয়েছে এমন বাচ্চা নিন। এতে ঠান্ডা লাগবে না। বাচ্চা পাখি খাচায় রাখা যাবে না। জুতার বাক্সে তুলা বা নরম কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে। নয়তো ঠান্ডা লেগে যাবে। ঢেকে রাখার সময় খেয়াল রাখবেন যেন বাতাস ঢুকতে পারে।
শালিক পাখির বাচ্চা কখন পাওয়া যায়
শালিক পাখি সাধারণত বর্ষাকালে বাচ্চা করে। তবে গ্রীষ্মের শেষেও পাওয়া যায়। অর্থাৎ মে থেকে জুলাই মাসে শালিকের বাচ্চা পাবেন। এ সময়ে শালিক পাখি খেয়াল করলে দেখবেন ঠোঁটে পোকা নিয়ে উড়ে কোথাও যাচ্ছে। তারমানে বেবি ফুটিয়েছে। গ্রামের দিকে হলে নারিকেল গাছ বা সুপারি গাছ খেয়াল করলে গর্তে বাসা পাবেন। তবে নিশ্চিত হয়ে গর্তে হাত ঢোকাবেন। গর্তে সাপ বা ইদুর ও থাকতে পারে।
গো শালিক ছাড়া বাকি সব শাকিক এক জোড়া বাচ্চা ফোটায়।
অনেক ফেসবুক গ্রুপে দেখবেন অনেকে হোম ব্রিড বেবি বিক্রির পোস্ট দেয়। বাংলাদেশে এখনো কেউ খাচায় শালিকের বাচ্চা ফোটাতে পারে নাই। কাজেই হোম ব্রিড বেবি কিনে প্রতারিত হবেন না।
শালিক পাখির বাচ্চার দাম
আমি কখনো কিনিনি। গ্রামের দিকে গেলে এমনিতেই পাওয়া যায় ২০০-৩০০ টাকা দিয়েই কেনা যায়। অথবা আপনি যদি কোন বাসা খুজে পান তাহলে যে কাউকে ১০০ টাকা দিলেই বাসা থেকে বাচ্চা নামিয়ে দেয়।
শালিকের খাচার মাপ
ছোট বেবি গুলো জুতার বাক্সেই রাখবেন। যখন পালক পুরোপুরি গজিয়ে যাবে তখন খাচায় দিবেন। একটা পাখির জন্য ১২*১৮ ইঞ্চি খাচা যথেষ্ট। তবে ২৪*২৪ অথবা ১৮*১৮ ইঞ্চি হলে ভালো হয়। খাচায় খাবার পানি ও খাবারের বাটি দিতে হবে। অবশ্যই পাশাপাশি দুইটা পার্চ বা ডাল দিবেন বসার জন্য। নিম ডাল হলে ভালো হয়। তবে প্লাস্টিকের পাইপ দিবেন না। পাখি পোষ মেনে গেলে ছেড়ে রাখা যায়। তবে যখন ছেড়ে রাখবেন তখন খেয়াল রাখবেন আসেপাশে কোন কাক যেন না থাকে।
তাছাড়া কোন পাখিই ১০০% পোষ মানে না। ফলে আপনার অতিপ্রিয় পোষা পাখিও উড়ে যেতে পারে। আমি আমার শালিক নিয়ে ধানের মাঠে চলে যাই। মাঠে কোন গাছ পালা নেই। আমার পাখি ইচ্ছা মত উড়াউড়ি করা, পোকা ধরে খায়। এরপরে আধা ঘন্টা বা এক ঘন্টা পরে চলে আসি।
শালিকের খাবার
শালিক সর্বভুক পাখি। তারমানে এই না খাচায় পোষার ক্ষেত্রে সব খেতে দিবেন। অতিরিক্ত লবণ এবং চিনিযুক্ত খাবার দেয়া যাবে না।
একেবারে ছোট বাচ্চা কে মুরগির ফিড পানিতে নরম করে খাওয়াবেন। বাচ্চা পাখিকে খাওয়ানো একেবারেই সহজ। যেকোন চা চামচের হাতলে নরম খাবার নিয়ে বাচ্চার কাছে নিলেই হা করবে তখন বাচ্চার গলায় দিয়ে দিবেন। ফিড নরম করার সময় যেন পানি থাকে সেদিকে খেয়াল রাখবেন। বাচ্চা পাখি পানি খেতে পারে না। ফলে ফিড শুকনা হলে পাখির গিলতে সমস্যা হয়।
বড় হলে এই ফিডই শক্ত অবস্থায় খেতে পারে। তবে আমি খেয়াল করেছি ফিড খাওয়ালে পাখির পালক চকচকে থাকে না। সেক্ষেত্রে ফিডের পাশাপাশি পাকা ফল দিলে এই সমস্যা অনেকটা কমে যায়।
জ্যান্ত ঘাসফড়িং বা তেলাপোকা খুব মজা করে খায়। কাজেই আপনার বাসায় তেলাপোকার একটা সমাধান হয়েছে ধরে নিন। যেকোনো পোকা মাকড়, শাক সবজি শালিক পাখিকে দিতে পারেন। এরা এমনকি টিকটিকিও খায়।
শালিকের মেল ও ফিমেল পাখি কীভাবে চিনবেন
মেল পাখির পা ফিমেল পাখির চেয়ে মোটা হয়। এক্ষেত্রে সমস্যা হলো মেল ও ফিমেল পাখি পাশাপাশি না রাখলে, অভিজ্ঞতা না থাকলে চেনা কঠিন। তবে মেল পাখি হাতের তালুতে নিলে হাতের সাথে মেটিং করার চেষ্টা করে।
এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে খাচায় ব্রিড করাতে পারে নাই। ফলে মেল ফিমেল নিয়ে চিন্তা করার কিছু নাই। কিন্তু যদি ব্রিড করানোর চিন্তা থাকে তাহলে ডিএনএ টেস্ট করাতে পারেন।
শালিক পাখির রোগ
এরা বেশ শক্ত পাখি। সহজে রোগ বালাই হয় না। খাবার ও পানির পাত্র পরিষ্কার রাখলে অধিকাংশ রোগবালাই থেকে মুক্ত রাখা যায়। তবে সরাসরি ফ্যানের বাতাস লাগালে অনেক সময় ঠান্ডা লেগে যায়।
শালিক পাখি কত দিন বাচে
আমার পাখির বয়স ৫ বছর। ঠিক কত দিন বাচে বলা মুশকিল। তবে আমার এক আত্মীয়ের একটা ছিলো ৮ বছর বয়সী। সেটাও বিড়ালের কামড়ে মারা গেছে। কাজেই ঠিকমত যত্ন নিলে ১০ বছর বাচবে ধরে নেয়া যায়।
উপসংহার
পাখি পালন একটি কমিটমেন্টের বিষয়। সেটা শালিক পাখিই হোক বা মুরগীই হোক। একটা পাখি যখন আপনি বাসায় আনবেন তখন সে আপনার পরিবারের একজন সদস্য হয়ে যাবে। অন্যান্য সদস্যদের যেভাবে আপনি যত্ন নেন পাখিকেও সেভাবে যত্ন নিতে হবে। আশা করি উপরের দেখানো পদ্ধতিতে শালিক পাললে আপনার পাখি অনেক দিন বাচবে। আর আপনি পাবেন অবসর কাটানোর চমৎকার একজন সঙ্গী।
আরও পড়ুন- ককাটেল পাখি পালন পদ্ধতি